বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিং সেবার যাত্রা শুরু হয়েছিল ভালো কিছু প্রত্যাশা নিয়ে। কিন্তু বর্তমানে এই খাতের পরিস্থিতি অনেকটাই বিশৃঙ্খল। যাত্রীরা অনেক সময় নিজেদের সিএনজি অটোরিকশা চালকদের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল অবস্থায় দেখতে পান। এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ার পর রাইড শেয়ারিং সেবাগুলোও ভাড়া বাড়িয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই ভাড়া বৃদ্ধিতে যাত্রী কিংবা চালক কেউ কি স্বস্তি পেয়েছেন? উত্তর হলো: না। বরং বাড়তি ভাড়া মধ্য ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত যাত্রীদের পকেটে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
একই সময়ে চালকদেরও বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় এবং রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলোর উচ্চ কমিশনের চাপ সামলাতে হচ্ছে। এই দুই পক্ষের মাঝখানে রয়েছে মুনাফাভিত্তিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান। তাই এখন প্রচলিত চিন্তার বাইরে গিয়ে আরও মানবিক ও কার্যকর পরিবর্তনের কথা ভাবার সময় এসেছে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের সড়কে রাইড শেয়ারিংয়ের বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাত্রীরা অ্যাপের মাধ্যমে রাইডের অনুরোধ করেন এবং অপেক্ষা করেন, অথচ অনেক চালক অনুরোধ গ্রহণ না করেই চলে যান। কেউ কেউ অ্যাপ চালু রাখলেও যাত্রীর গন্তব্য পছন্দ না হলে রাইড বাতিল করেন। এরপর শুরু হয় ভাড়া নিয়ে দরকষাকষি। এই পরিস্থিতিতে কর্মজীবী নারী, অসুস্থ রোগী এবং প্রবীণ নাগরিকদের কী অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়, তা সহজেই অনুমেয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু চালক কার্ড বা মোবাইল পেমেন্ট গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান, কারণ তাদের হাতে নগদ অর্থ প্রয়োজন। অন্যদিকে চালকদেরও অসন্তোষের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রচণ্ড রোদ কিংবা মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালানো কোনো সহজ পেশা নয়। ট্রাফিক মামলার ঝুঁকি, সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কা এবং প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও তাদের কাজ করতে হয়। ফলে রাইড শেয়ারিং খাতের বর্তমান বিশৃঙ্খলা মূলত যাত্রী ও চালকের মধ্যে তৈরি হওয়া একটি অর্থনৈতিক ও পারস্পরিক স্বার্থের সংঘাত।
চালকদের রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহারে অনীহা এবং অফলাইন বা অনানুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি যাত্রী নেওয়ার অন্যতম কারণ হলো প্ল্যাটফর্মগুলোর উচ্চ সেবা মাশুল বা কমিশন। কিছু প্ল্যাটফর্ম প্রতিটি ট্রিপ থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে নেয় বলে জানা যায়। বিষয়টি গভীরভাবে দেখলে প্রশ্ন ওঠে প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের এত বড় অংশ কেন চালক বা গাড়ির মালিককে দিতে হবে? গাড়ি বা মোটরসাইকেল কিনতে তারা বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেন। গাড়ি বা মোটরসাইকেলের মেরামত, টায়ারের ক্ষয়, লুব্রিকেশন ও তেল পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ব্যয়সহ সব খরচ তাদেরই বহন করতে হয়। এর পাশাপাশি রয়েছে তাদের শারীরিক শ্রম। অথচ শেষ পর্যন্ত উপার্জনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মকে দিতে হচ্ছে সংযোগ ও সেবা ব্যবহারের বিনিময়ে। অবশ্যই কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় রয়েছে এবং তা মেটানো প্রয়োজন। কিন্তু কমিশন কাটার মাত্রা চালকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছে। ফলে অনেক চালক ধীরে ধীরে অফলাইন সেবার দিকে ঝুঁকছেন।
এই সংকট মোকাবিলায় প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হওয়া উচিত রাইড শেয়ারিং কমিশন সর্বোচ্চ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। ৫ শতাংশ কমিশন চালু করা হলে চালকদের অনলাইনে সক্রিয় থাকার জন্য বাড়তি প্রণোদনা তৈরি হবে। তারা যদি নিশ্চিত থাকেন যে তাদের উপার্জনের বড় অংশই নিজেদের কাছে থাকবে, তাহলে অ্যাপ ছেড়ে অফলাইনে কাজ করার প্রবণতাও কমতে পারে। এর সরাসরি সুফল পাবেন যাত্রীরা, কারণ সহজে ও দ্রুত রাইড পাওয়া সম্ভব হবে। রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো অবশ্য যুক্তি দিতে পারে যে ৫ শতাংশ কমিশন তাদের পরিচালন ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তবে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ট্রিপ পরিচালিত হওয়ার কারণে অল্প শতাংশ কমিশন থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় করা সম্ভব। প্রয়োজনে সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ খাতকে উৎসাহিত করতে এবং চালকদের সুরক্ষা দিতে নির্দিষ্ট আর্থিক প্রণোদনা বা কর সুবিধার কথা বিবেচনা করতে পারে। তীব্র গণপরিবহন সংকটে থাকা জনবহুল শহরগুলোতে রাইড শেয়ারিং এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং নগর পরিবহনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বেসরকারি কোম্পানিগুলো যদি যাত্রী ও চালক উভয়ের জন্য ন্যায্য নীতি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে রাষ্ট্র নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারে না। সরকারকে উদ্ভাবনী ও বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বাংলা কিউআর উদ্যোগের মাধ্যমে যেমন একটি সর্বজনীন ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে, একই ধরনের ধারণা অনুসরণ করে রাইড শেয়ারিংয়ের জন্য একটি ‘ন্যাশনাল ওপেন ডিজিটাল রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম’ বা জাতীয় উন্মুক্ত ডিজিটাল রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) যৌথভাবে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নিতে পারে, যেখানে নিবন্ধিত চালক ও যাত্রীরা একটি নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় সেবা নিতে পারবেন। এমন একটি প্ল্যাটফর্মে ইচ্ছামতো ভাড়া নির্ধারণ, অতিরিক্ত চাহিদার সময় অস্বাভাবিকভাবে ভাড়া বাড়ানো কিংবা একতরফাভাবে কমিশন পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত থাকবে। একটি স্বচ্ছ ভাড়া কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। অবস্থানভিত্তিক প্রযুক্তির সহায়তায় এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এতে চালকেরা যাত্রীর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করতে পারবেন না এবং একই সঙ্গে চালকরাও তাদের শ্রমের ন্যায্য পারিশ্রমিক পাবেন। এর লক্ষ্য হবে কার্যকর সরকারি নজরদারির আওতায় একটি স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এখন প্রয়োজন এমন একটি কৌশল, যেখানে কোনো পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আধুনিক প্রযুক্তি, যাতায়াতের সুবিধা এবং রাইড শেয়ারিং খাতের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া কর্মসংস্থানের সুযোগ অবশ্যই ধরে রাখতে হবে। একই সঙ্গে এই ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা ও সম্ভাব্য অনিয়মও মোকাবিলা করতে হবে। রাইড শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়।
রাইড শেয়ারিংয়ে বিশৃঙ্খলা! সমাধান প্রয়োজন
-মোকাররম হোসেন শুভ
(সাংবাদিক ও কলামিস্ট)

